এই দুইটি উক্তি একসাথে বিশ্লেষণ করলে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে বিনিয়োগ ও ট্রেডিংয়ের মানসিকতা বোঝার জন্য অসাধারণ একটি শিক্ষা পাওয়া যায়।
এখানে জেসি লিভারমোর এবং আল ব্রুকস দুজনেই এক কথায় বলছেন— “বাজারে অনুমান নয়, পর্যবেক্ষণই আসল শক্তি।”
চলুন এখন একজন এক্সপার্ট বিশ্লেষকের দৃষ্টিতে এটি বাংলাদেশি প্রেক্ষাপটে ব্যাখ্যা করা যাক।
১. উক্তির মূল মর্ম
জেসি লিভারমোর:
“Don't anticipate! Wait until the market gives you the clues, the signals, the hints, before you move.”
অর্থাৎ, বাজারে আগেভাবে অনুমান করে পদক্ষেপ নেবেন না। বরং বাজার নিজে যখন সংকেত দেবে—যখন দাম, ভলিউম, এবং বিনিয়োগকারীদের আচরণে পরিবর্তন দেখা যাবে—তখনই সিদ্ধান্ত নিন।
আল ব্রুকস:
“Prediction is the weakest part of trading. Observation is the strongest.”
অর্থাৎ, ট্রেডিংয়ে অনুমান করার চেষ্টা সবচেয়ে দুর্বল জায়গা। সফলতা আসে ধৈর্য ধরে বাজার পর্যবেক্ষণ ও সংকেত বিশ্লেষণের মাধ্যমে।
এই দুইজনের কথার সারমর্ম হলো—ট্রেডার বা বিনিয়োগকারীকে ভবিষ্যৎ অনুমান করার খেলায় নয়, বরং বর্তমান বাস্তবতা পড়ার খেলায় অংশ নিতে হবে।
২. ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে অনুমানভিত্তিক বিনিয়োগের বাস্তবতা
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (DSE) বিনিয়োগকারীদের একটি বড় অংশ গুজব বা আশা ভিত্তিক ট্রেড করে থাকেন।
যেমন:
-
“এই কোম্পানি বড় ডিভিডেন্ড দেবে।”
-
“ওই শেয়ারটা এখন উঠবে।”
-
“অমুক গ্রুপ কিনছে, আমিও কিনি।”
এই মানসিকতা আসলে “anticipation”—অর্থাৎ আগেভাবে অনুমান করা।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, বাজারে এসব অনুমান বেশিরভাগ সময় ভুল প্রমাণিত হয়,
কারণ বাজারের দিক নির্ধারণ করে চাহিদা, সরবরাহ, সংবাদপ্রবাহ, এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর মনোভাব।
৩. পর্যবেক্ষণ মানে বাজারের সংকেত পড়া
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে সফল ট্রেডাররা সাধারণত “observe first, act later” নীতিতে চলে।
তারা দাম বাড়ছে কেন, কমছে কেন—এটি বিশ্লেষণ করে, তারপর সিদ্ধান্ত নেয়।
বাজারে তিনটি জিনিস নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা উচিত:
-
Price Action (দামের গতিবিধি): দাম কিভাবে উঠছে বা নামছে।
-
Volume (লেনদেনের পরিমাণ): অংশগ্রহণ বাড়ছে না কমছে।
-
Market Sentiment (বাজারের মনোভাব): বিনিয়োগকারীরা আশাবাদী নাকি আতঙ্কিত।
যখন এই তিনটি সংকেত একই দিকে যায়, তখনই সেটি একটি নির্ভরযোগ্য ইঙ্গিত—
তখন পদক্ষেপ নেওয়া নিরাপদ।
এটাই “wait for the clues” নীতি।
৪. অনুমান বনাম পর্যবেক্ষণ: বাস্তব উদাহরণ
ধরা যাক, কোনো সিমেন্ট কোম্পানির শেয়ার কয়েকদিন ধরে স্থির ছিল।
হঠাৎ ভলিউম বেড়ে দাম সামান্য উঠতে শুরু করল।
এই সময় দুই ধরনের বিনিয়োগকারী দেখা যায়—
-
অনুমানকারী (anticipator):
ভাবে “এখনই উঠবে” এবং তাৎক্ষণিক কেনে।
পরদিন বাজারে দাম আবার নেমে যায়। -
পর্যবেক্ষক (observer):
দেখে বাজারে আসলেই কি ক্রেতা বাড়ছে, দাম ধরে রাখতে পারছে কি না।
যখন ট্রেন্ড নিশ্চিত হয়, তখন ধীরে ধীরে প্রবেশ করে।
দ্বিতীয় বিনিয়োগকারী কম ঝুঁকি নিয়ে স্থিতিশীল লাভ করতে পারে,
কারণ সে বাস্তবের ওপর নির্ভর করে, অনুমানের ওপর নয়।
৫. কেন এই শিক্ষা DSE-তে সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ একটি অল্প-তরল (thin liquidity) এবং সংবেদনশীল বাজার।
এখানে খবর, গুজব, এবং প্রাতিষ্ঠানিক ক্রয়-বিক্রয়ের প্রভাব খুব দ্রুত দামকে প্রভাবিত করে।
তাই এখানে “prediction” আরও বিপজ্জনক।
যে বিনিয়োগকারী প্রতিদিনের বাজার পর্যবেক্ষণ করে,
কোম্পানির রিপোর্ট পড়ে, এবং বাজারের মনোভাব বুঝে পদক্ষেপ নেয়,
সে দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকতে পারে।
৬. বিনিয়োগকারীর জন্য প্রযোজ্য নির্দেশনা
-
গুজব নয়, তথ্য ও ট্রেন্ডের উপর সিদ্ধান্ত নিন।
-
দাম বা ভলিউমে পরিবর্তন এলে তা যাচাই করুন, অন্ধভাবে অনুসরণ করবেন না।
-
ধৈর্য ধরুন—প্রত্যেক সুযোগই সঙ্গে সঙ্গে কাজে লাগাতে হয় না।
-
কখনও নিজের “অনুমান”কে বাজারের চেয়ে বেশি বিশ্বাস করবেন না।
-
মনে রাখুন—বাজার সবসময় ঠিক, আমরা নই।
৭. উপসংহার
জেসি লিভারমোর ও আল ব্রুকসের এই কথাগুলো ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের প্রতিটি বিনিয়োগকারীর জন্য সময়োপযোগী পরামর্শ।
বাজারে টিকে থাকার মূলমন্ত্র হলো—
অনুমান নয়, পর্যবেক্ষণ। গুজব নয়, প্রমাণ। তাড়াহুড়া নয়, ধৈর্য।
বাজারকে আপনি কখনও নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন না,
কিন্তু বাজারকে বুঝে চলার ক্ষমতা আপনি গড়ে তুলতে পারেন।
সেটিই বিনিয়োগের সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র।
No comments:
Post a Comment